ভক্তিই শক্তি

প্রাণায়াম: পদ্ধতি, উপকারিতা ও সতর্কতা

প্রাণায়াম: পদ্ধতি, উপকারিতা ও সতর্কতা

প্রাণায়াম কী, যোগে এর স্থান কোথায়, পাঁচটি প্রধান পদ্ধতি কীভাবে করবেন — এবং কোন পদ্ধতি কাদের জন্য নিরাপদ নয়।

প্রাণায়াম শব্দটি দুটি অংশে ভাগ করা যায় — প্রাণ অর্থাৎ জীবনীশক্তি, এবং আয়াম অর্থাৎ বিস্তার বা নিয়ন্ত্রণ। শ্বাসকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে শরীর ও মনের উপর প্রভাব ফেলাই এর উদ্দেশ্য।

পতঞ্জলির যোগসূত্রে বর্ণিত অষ্টাঙ্গ যোগে প্রাণায়াম চতুর্থ অঙ্গ — যম, নিয়ম ও আসনের পরে এবং প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধির আগে। উপনিষদেও প্রাণের আলোচনা রয়েছে।

শুরুর আগে: কাদের সতর্ক থাকতে হবে

সব প্রাণায়াম সবার জন্য নয়। বিশেষত কপালভাতি ও ভস্ত্রিকা — এই দুটি জোরালো পদ্ধতি নিচের ক্ষেত্রে করা উচিত নয়:

  • উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ
  • গর্ভাবস্থা
  • হার্নিয়া বা সাম্প্রতিক পেটের অস্ত্রোপচার
  • মৃগীরোগ
  • গ্লুকোমা বা চোখের চাপজনিত সমস্যা
  • ঋতুস্রাব চলাকালীন (পরম্পরাগতভাবে এড়িয়ে চলা হয়)

হাঁপানি বা ফুসফুসের সমস্যা থাকলে কেবল ধীর ও মৃদু পদ্ধতি — যেমন নাড়ী শোধন বা উদরশ্বাস — করুন, এবং আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিন।

মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় বা অস্বস্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে থামুন এবং স্বাভাবিক শ্বাসে ফিরে আসুন। এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়।

পাঁচটি প্রধান পদ্ধতি

১. উদরশ্বাস (ডায়াফ্রাম্যাটিক ব্রিদিং)

কাদের জন্য: সবার — এখান থেকেই শুরু করা উচিত।

এক হাত বুকে, এক হাত পেটে রাখুন। নাক দিয়ে ধীরে শ্বাস নিন যাতে পেটের হাতটি ওঠে, বুকেরটি প্রায় স্থির থাকে। ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। ৫ মিনিট।

২. নাড়ী শোধন (অনুলোম-বিলোম)

কাদের জন্য: প্রায় সবার জন্য নিরাপদ। মানসিক চাপ ও উদ্বেগে সবচেয়ে উপযোগী।

  1. ডান হাতের বুড়ো আঙুলে ডান নাসারন্ধ্র বন্ধ করুন।
  2. বাঁ দিক দিয়ে ধীরে শ্বাস নিন।
  3. অনামিকা দিয়ে বাঁ দিক বন্ধ করে ডান দিক খুলুন, ডান দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন।
  4. ডান দিয়েই শ্বাস নিন, তারপর বাঁ দিয়ে ছাড়ুন।
  5. এই একটি চক্র। ৫–১০ চক্র করুন।

শুরুতে শ্বাস আটকে রাখার প্রয়োজন নেই।

৩. ভ্রামরী (ভ্রমরের গুঞ্জন)

কাদের জন্য: নিরাপদ ও শান্তিদায়ক। ঘুমের আগে বিশেষ উপযোগী।

চোখ বন্ধ করে বসুন। দুই তর্জনী দিয়ে কানের ফুটো হালকা বন্ধ করুন। নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে, শ্বাস ছাড়ার সময় ভ্রমরের মতো গুঞ্জন করুন। মাথায় কম্পন অনুভব করুন। ৫–১০ বার। কানে সংক্রমণ থাকলে করবেন না।

৪. উজ্জায়ী (সমুদ্রশ্বাস)

কাদের জন্য: নিরাপদ। আসন অভ্যাসের সময় সঙ্গে রাখা যায়।

গলার পেশি সামান্য সংকুচিত রেখে নাক দিয়ে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন, যাতে মৃদু সমুদ্রগর্জনের মতো শব্দ হয়। শ্বাস দীর্ঘ ও সমান রাখুন। ৫ মিনিট।

৫. কপালভাতি ও ভস্ত্রিকা

কাদের জন্য: সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য, এবং উপরের সতর্কতা তালিকা না মিললে। প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শেখাই ভালো।

কপালভাতি: সোজা হয়ে বসুন। পেট ভিতরে টেনে নাক দিয়ে জোরে শ্বাস ছাড়ুন; শ্বাস নেওয়া আপনাআপনি হবে। ২০ বার দিয়ে শুরু করুন।

ভস্ত্রিকা: শ্বাস নেওয়া ও ছাড়া — দুটিই সমান জোরে ও দ্রুত। ১০ বার, তারপর কয়েকটি স্বাভাবিক শ্বাস। ২–৩ রাউন্ড।

শরীরে কী প্রভাব পড়ে?

ধীর ও দীর্ঘ শ্বাস, বিশেষত দীর্ঘ প্রশ্বাস, প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে — যা হৃদস্পন্দন কমায় এবং শরীরকে বিশ্রামের অবস্থায় নিয়ে আসে। এটি প্রাণায়ামের সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রভাব।

নিয়মিত অভ্যাসে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ও শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, এবং মানসিক চাপের অনুভূতি কমে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

যোগদর্শনে বলা হয়, শ্বাস নাড়ী নামক শক্তিপথগুলিকে প্রভাবিত করে। এটি পরম্পরাগত ধারণা, আধুনিক শারীরবিদ্যার ভাষায় এর সরাসরি প্রতিশব্দ নেই — দুটিকে গুলিয়ে না ফেলাই ভালো।

আসনের সঙ্গে কীভাবে মেলাবেন

  • শ্বাস নেওয়ার সময় শরীর প্রসারিত করুন, ছাড়ার সময় ভাঁজ বা মোচড়ে যান।
  • দাঁড়ানো আসনে সমান শ্বাস ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।
  • কোনো আসনে শ্বাস আটকে যাচ্ছে মানে আপনি সামর্থ্যের বাইরে যাচ্ছেন — একটু পিছিয়ে আসুন।
  • ক্রম: প্রথমে কয়েক মিনিট প্রাণায়াম, তারপর আসন, শেষে শবাসন ও মৃদু শ্বাস-অভ্যাস।

দিনে ১০–১৫ মিনিট যথেষ্ট। খালি পেটে বা খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পরে করুন।

সাধারণ প্রশ্ন

প্রাণায়াম কী?

শ্বাসকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার যোগিক পদ্ধতি। পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গ যোগে এটি চতুর্থ অঙ্গ।

নতুনদের কোনটি দিয়ে শুরু করা উচিত?

উদরশ্বাস দিয়ে শুরু করুন, তারপর নাড়ী শোধন ও ভ্রামরী। এই তিনটিই মৃদু ও নিরাপদ।

কপালভাতি কাদের করা উচিত নয়?

উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, গর্ভাবস্থা, হার্নিয়া, মৃগীরোগ বা গ্লুকোমা থাকলে করা উচিত নয়। সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দিনে কতক্ষণ করা উচিত?

১০–১৫ মিনিট যথেষ্ট। খালি পেটে বা খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে করাই ভালো।

হাঁপানি থাকলে করা যায়?

কেবল ধীর ও মৃদু পদ্ধতি, এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে। জোরালো পদ্ধতি এড়িয়ে চলুন।

অভ্যাসের সময় মাথা ঘুরলে কী করব?

সঙ্গে সঙ্গে থামুন, স্বাভাবিক শ্বাস নিন এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন। বারবার হলে অভ্যাস বন্ধ করে পরামর্শ নিন।

শিশু বা বয়স্করা করতে পারেন?

মৃদু পদ্ধতিগুলি সাধারণত উপযোগী। জোরালো প্রাণায়াম শিশু ও বয়স্কদের জন্য উপযুক্ত নয়।

Jeevan Tipke
Written by

Bachelor of Engineering (B.E.), MBA | Certified Digital Marketing Professional (SEMrush, LinkedIn, Amazon, Skillup & HubSpot)

Jeevan Tipke writes on Hindu devotion at BhaktiMeShakti, covering aartis, chalisas and mantras alongside the stories, puja vidhi and fasting rules behind major deities and festivals.