ভক্তিই শক্তি

গণেশ চতুর্থী ২০২৬: তারিখ, ইতিহাস ও তাৎপর্য

গণেশ চতুর্থী ২০২৬: তারিখ, ইতিহাস ও তাৎপর্য

গণেশ চতুর্থী ২০২৬ কবে?

গণেশ চতুর্থী, যা গণেশোৎসব বা বিনায়ক চতুর্থী নামেও পরিচিত, ভগবান গণেশের উদ্দেশে নিবেদিত সবচেয়ে বড় উৎসব।

২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী পড়েছে ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার। দশ দিনের এই উৎসব শেষ হয় অনন্ত চতুর্দশীতে গণেশ বিসর্জনের মাধ্যমে — ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার। স্থানীয় পঞ্জিকাভেদে সময়ে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।

বাংলায় গণেশ আরাধনা

মহারাষ্ট্রের মতো দশ দিনের সর্বজনীন গণেশোৎসব বাংলায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত ছিল না। বাংলায় গণেশ পূজিত হন মূলত দুর্গাপূজার অঙ্গ হিসেবে — দুর্গা প্রতিমার একপাশে গণেশ ও কার্তিক, অন্যপাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী। বাঙালি ঘরে গণেশ তাই দেবীর পুত্র হিসেবেই সবচেয়ে পরিচিত।

এছাড়া লক্ষ্মী-গণেশ পূজা — বিশেষত ব্যবসায়ীদের হালখাতা ও নতুন কাজের সূচনায় — বাংলায় দীর্ঘদিনের রীতি।

গত কয়েক দশকে কলকাতা ও অন্যান্য শহরে সর্বজনীন গণেশ পূজার প্রচলন বেড়েছে, বিশেষত মারাঠি ও গুজরাটি সম্প্রদায়ের উদ্যোগে এবং স্থানীয় ক্লাবগুলির আয়োজনে।

গণেশকে প্রথমে পূজা করা হয় কেন?

বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, ব্যবসার সূচনা, যেকোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান — সবেতেই প্রথমে গণেশের আরাধনা হয়। তাই তাঁর নাম প্রথম পূজ্য

তাঁর নানা নাম:

  • বিঘ্নহর্তা — বাধা দূরকারী
  • সিদ্ধিবিনায়ক — সিদ্ধিদাতা
  • গণপতি — গণসমূহের অধিপতি
  • লম্বোদর — বৃহৎ উদরধারী
  • একদন্ত — এক দন্তবিশিষ্ট
  • বুদ্ধিপ্রিয় — প্রজ্ঞার প্রিয়

গণেশের জন্মকাহিনি

শিবপুরাণ অনুসারে, দেবী পার্বতী স্নানের প্রস্তুতির সময় নিজের অঙ্গের হরিদ্রা-লেপ দিয়ে একটি বালক গড়েন এবং তাতে প্রাণসঞ্চার করে দ্বার পাহারা দিতে বলেন — কাউকে ভিতরে ঢুকতে না দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে।

ভগবান শিব কৈলাসে ফিরে এলে বালকটি তাঁকে চিনতে না পেরে বাধা দেন। ক্রুদ্ধ শিব সেই সংঘর্ষে বালকের মস্তক ছিন্ন করেন।

পার্বতীর শোক দেখে শিব প্রতিশ্রুতি দেন সন্তানকে ফিরিয়ে দেওয়ার। তিনি গণদের নির্দেশ দেন, উত্তরমুখী প্রথম যে প্রাণীর দেখা মিলবে, তার মস্তক নিয়ে আসতে। তাঁরা একটি হস্তীশাবকের মস্তক নিয়ে ফেরেন।

শিব সেই হস্তীমস্তক বালকের দেহে স্থাপন করে তাকে পুনর্জীবিত করেন এবং ঘোষণা করেন — এই দিন থেকে প্রতিটি দেবতার আগে ও প্রতিটি শুভকার্যের সূচনায় তাঁর পূজা হবে।

গণেশের রূপের প্রতীকী অর্থ

  • হস্তীমুখ — প্রজ্ঞা ও সাধারণ সীমার বাইরে ভাবার ক্ষমতা।
  • বড় কান — বেশি শোনা, কম বলা।
  • ছোট চোখ — একাগ্রতা ও গভীর মনোযোগ।
  • বৃহৎ উদর — সুখ-দুঃখ দুই-ই শান্তভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা।
  • ভাঙা দন্ত — ত্যাগ ও উচ্চতর উদ্দেশ্যে কষ্ট স্বীকার।
  • মূষিক — কামনা ও অহংকার। মূষিকে আরূঢ় গণেশ বোঝান, প্রজ্ঞাই কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, উল্টোটা নয়।
  • মোদক — আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধুর্য।

বিস্তারিত: ভগবান গণেশ — তাৎপর্য ও প্রতীক

সর্বজনীন গণেশোৎসবের ইতিহাস

গণেশ আরাধনা হাজার বছরের পুরনো হলেও সর্বজনীন উৎসব হিসেবে গণেশ চতুর্থীর সূচনা তুলনায় সাম্প্রতিক।

১৮৯৩ সালে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক এই গৃহকেন্দ্রিক পূজাকে সর্বজনীন উৎসবে রূপ দেন। ব্রিটিশ শাসনে রাজনৈতিক জমায়েতে কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল; তিলক বুঝেছিলেন, একটি ধর্মীয় উৎসব জাতি ও সম্প্রদায়ের ভেদ পেরিয়ে মানুষকে এক জায়গায় আনতে পারে।

তিনি সর্বজনীন মণ্ডপ, কীর্তন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রার প্রচলন করেন। এই উদ্যোগ ভক্তির সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামেও ঐক্যের ভিত গড়ে দেয়।

বাংলায় প্রায় একই সময়ে দুর্গাপূজাও বারোয়ারি রূপ নিচ্ছিল — দুই অঞ্চলে দুই দেবতাকে ঘিরে একই ধরনের সামাজিক পরিবর্তন।

মুম্বই ও মহারাষ্ট্রে

গণেশ চতুর্থী বলতে সবার আগে মনে আসে মুম্বই। দশ দিন ধরে শহর ভক্তি, সংগীত ও শিল্পের এক বিশাল আয়োজনে পরিণত হয়।

প্রসিদ্ধ মণ্ডপগুলির মধ্যে রয়েছে লালবাগচা রাজা (যাঁকে বলা হয় “নবসাচা গণপতি” — মানতপূরণকারী), জিএসবি সেবা মণ্ডল (সোনার অলংকারে সজ্জিত প্রতিমা), গণেশ গলি মুম্বইচা রাজা, অন্ধেরিচা রাজাখেতওয়াড়ি গণরাজ

মণ্ডলগুলি কেবল পূজা নয় — রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অন্নদান ও শিক্ষামূলক কর্মসূচিও আয়োজন করে।

বিস্তারিত: মুম্বইয়ের বিখ্যাত গণপতি মণ্ডপ

ভারতের নানা অঞ্চলে

  • কর্ণাটক — কড়ুবু ও মোদক নিবেদন; মাটির প্রতিমা ও স্থানীয় জলাশয়ে বিসর্জন।
  • অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানাবিনায়ক চবিতি; হায়দরাবাদে বিশাল সর্বজনীন মণ্ডপ।
  • তামিলনাড়ুবিনায়গর চতুর্থী; কোঝুক্কট্টৈ নিবেদন করা হয়, যা মোদকেরই আরেক রূপ।
  • গোয়াচবথ; পরিবার পৈতৃক বাড়িতে একত্র হয়, প্রাকৃতিক পাতা দিয়ে ঘর সাজানো হয়।
  • গুজরাট — আমেদাবাদ, সুরাট ও বরোদায় বড় মণ্ডপ।

ভারতের বাইরেও আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মরিশাস, নেপাল ও উপসাগরীয় দেশগুলিতে প্রবাসী ভারতীয়রা এই উৎসব পালন করেন।

পূজার রীতি

  1. ঘর পরিষ্কার ও সজ্জা — আলপনা, ফুল, আমপাতা ও আলো।
  2. প্রতিমা স্থাপন — পূর্ব বা উত্তরমুখী করে সাজানো বেদিতে।
  3. প্রাণপ্রতিষ্ঠা — মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে প্রতিমায় দেবতার আবাহন।
  4. নিত্য পূজা ও আরতি — দশ দিন ধরে ফুল, দূর্বা, মোদক, নারকেল ও ফল নিবেদন।
  5. বিসর্জন — অনন্ত চতুর্দশীতে জলে প্রতিমা বিসর্জন।

দূর্বা গণেশ পূজার অপরিহার্য উপকরণ — সাধারণত ২১টি দূর্বা নিবেদন করা হয়।

বিসর্জনের অর্থ

বিসর্জনের সময় ধ্বনি ওঠে — “গণপতি বাপ্পা মোরিয়া, পুঢ়চ্যা বর্ষী লবকর ইয়া!” অর্থাৎ, গণপতির জয়, আগামী বছর তাড়াতাড়ি আসুন।

এর পিছনে গভীর ভাবনা রয়েছে: যা কিছু গড়া হয়, তা একদিন প্রকৃতিতেই ফিরে যায়। ভক্তিভরে আবাহন, তারপর সম্মানের সঙ্গে বিদায় — সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের এই চক্রই বিসর্জনের শিক্ষা।

বাঙালি পাঠকের কাছে এই ভাব অচেনা নয় — দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীতেও ঠিক এই একই অনুভব।

পরিবেশবান্ধব উৎসব

  • প্লাস্টার অফ প্যারিসের বদলে মাটির প্রতিমা।
  • প্রাকৃতিক, বিষমুক্ত রং।
  • ফুল, পাতা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণে সজ্জা।
  • সম্ভব হলে কৃত্রিম জলাশয়ে বিসর্জন।
  • মাইকের বদলে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র।

সাধারণ প্রশ্ন

২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী কবে?

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার। বিসর্জন ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার — অনন্ত চতুর্দশীতে।

বাংলায় গণেশ কীভাবে পূজিত হন?

মূলত দুর্গাপূজার অঙ্গ হিসেবে — দুর্গা প্রতিমার পাশে দেবীর পুত্র রূপে। এছাড়া লক্ষ্মী-গণেশ পূজা ও নতুন কাজের সূচনায়। সর্বজনীন গণেশ পূজার প্রচলন সাম্প্রতিক।

উৎসব দশ দিনের কেন?

দশ দিন ধরে গৃহে দেবতাকে আবাহন, নিত্য পূজা, এবং শেষে সম্মানের সঙ্গে বিদায় — সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের চক্রের প্রতীক।

সর্বজনীন গণেশোৎসব কে শুরু করেন?

১৮৯৩ সালে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক, ব্রিটিশ শাসনে জনসমাগমের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ঐক্য গড়ার উদ্দেশ্যে।

মোদক নিবেদন করা হয় কেন?

মোদক গণেশের প্রিয় বলে মানা হয়, এবং তা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধুর্যের প্রতীক।

দূর্বা কেন নিবেদন করা হয়?

দূর্বা গণেশ পূজার অপরিহার্য উপকরণ; সাধারণত ২১টি দূর্বা নিবেদনের রীতি রয়েছে।

পরিবেশবান্ধব উৎসব কীভাবে পালন করব?

মাটির প্রতিমা, প্রাকৃতিক রং, ফুল-পাতার সজ্জা এবং সম্ভব হলে কৃত্রিম জলাশয়ে বিসর্জন।

Jeevan Tipke
Written by

Bachelor of Engineering (B.E.), MBA | Certified Digital Marketing Professional (SEMrush, LinkedIn, Amazon, Skillup & HubSpot)

Jeevan Tipke writes on Hindu devotion at BhaktiMeShakti, covering aartis, chalisas and mantras alongside the stories, puja vidhi and fasting rules behind major deities and festivals.