বড়দিনের ইতিহাস — প্রাচীন শীতকালীন উৎসব থেকে আজকের উদ্যাপন পর্যন্ত। প্রতীকের উৎস, ২৫ ডিসেম্বর তারিখটি কীভাবে এল, এবং কলকাতায় বড়দিনের নিজস্ব ধারা।
বাংলায় ক্রিসমাসকে বলা হয় বড়দিন। নামটি নিজেই কৌতূহলোদ্দীপক — উত্তর গোলার্ধে ২৫ ডিসেম্বর বছরের সবচেয়ে ছোট দিনগুলির একটি। প্রচলিত ব্যাখ্যা, শীতকালীন অয়নান্তের পর থেকে দিন আবার বড় হতে শুরু করে; সেই ঘুরে দাঁড়ানোর দিনই বড়দিন।
এই ব্যুৎপত্তিটিই এই উৎসবের ইতিহাসের সারমর্ম — খ্রিস্টীয় পর্ব ও প্রাচীন শীতকালীন উৎসবের মিশ্রণ।
খ্রিস্টধর্মের আগে: শীতকালীন উৎসব
যিশুর জন্মের বহু আগে থেকেই ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শীতকালীন অয়নান্ত (২১–২২ ডিসেম্বর) ঘিরে উৎসব হত — বছরের সবচেয়ে ছোট দিন, যার পর সূর্য আবার ফিরে আসে।
- ইউল (উত্তর ইউরোপ) — সূর্যকে স্বাগত জানাতে কাঠ পোড়ানোর রীতি।
- স্যাটার্নালিয়া (রোম) — সপ্তাহব্যাপী ভোজ, উপহার বিনিময় ও আনন্দোৎসব।
- সোল ইনভিক্টাস (রোম) — “অপরাজিত সূর্য”-এর উদ্যাপন।
ভোজ, উপহার, চিরসবুজ পাতার সাজ, মোমবাতি ও সমবেত গান — আজকের বড়দিনের অনেক উপাদানই এই উৎসবগুলিতে ছিল।
২৫ ডিসেম্বর তারিখটি কীভাবে এল?
বাইবেলে যিশুর জন্মের বিবরণ আছে, কিন্তু দিন বা মাসের উল্লেখ নেই। প্রথম দিকের খ্রিস্টানরা নানা সময়ে এই দিন পালন করতেন।
৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে রোমে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালনের প্রথম লিখিত নথি পাওয়া যায়। তারিখ নির্বাচনের পিছনে দুটি ব্যাখ্যা প্রচলিত:
- প্রতীকী কারণ। অয়নান্তে আলোর প্রত্যাবর্তন — যিশুকে “জগতের আলো” বলা হয়, তাই সাযুজ্য।
- সাংস্কৃতিক কারণ। প্রচলিত শীতকালীন উৎসবের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে নতুন পর্বটি সহজে গ্রহণযোগ্য হয়।
পোপ জুলিয়াস প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এই তারিখ ঘোষণা করেছিলেন — এই কথাটি বহুল প্রচলিত, তবে এর সমর্থনে কোনো সমকালীন নথি নেই। ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
মধ্যযুগে উৎসবের বিকাশ
মধ্যযুগে (পঞ্চম–পঞ্চদশ শতক) বড়দিন ধর্মীয় আচার থেকে বৃহত্তর সামাজিক উৎসবে পরিণত হয় — গির্জার অনুষ্ঠান, যিশুর জন্মপর্বের নাট্যরূপ, ক্যারল, সমবেত ভোজ এবং চিরসবুজ পাতা ও মিসলটো দিয়ে সাজসজ্জা।
দুটি উল্লেখযোগ্য পরম্পরা এই সময়েই গড়ে ওঠে:
- ক্যারল। শুরুতে ঋতু-উৎসবের গান; পরে ধীরে ধীরে ভক্তিমূলক রূপ নেয় এবং যিশুর জন্মকাহিনি বলতে শুরু করে।
- ক্রিব বা জন্মদৃশ্য। ত্রয়োদশ শতকে সেন্ট ফ্রান্সিস অফ অ্যাসিসি এই রীতির প্রচলন করেন — মেরি, জোসেফ, পশু, দেবদূত ও মেষপালকদের নিয়ে গড়া দৃশ্য।
প্রতীকগুলির উৎস
- ক্রিসমাস ট্রি। চিরসবুজ গাছ শীতেও জীবনের প্রতীক — ধারণাটি প্রাচীন। সাজানো গাছের রীতি জার্মানিতে ষোড়শ শতকে, এবং ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় ঊনবিংশ শতকে ছড়িয়ে পড়ে।
- সান্তা ক্লজ। চতুর্থ শতকের বিশপ সেন্ট নিকোলাস, ওলন্দাজ সিন্টারক্লাস এবং ঊনবিংশ শতকের কবি ও চিত্রশিল্পীদের কল্পনা — এই তিনের মিশ্রণে আজকের রূপ।
- উপহার। তিন জ্ঞানী ব্যক্তির (ম্যাজাই) উপহারের স্মরণ, সেই সঙ্গে স্যাটার্নালিয়ার উপহার-প্রথার ধারাবাহিকতা।
- তারা। বেথলেহেমের তারা, যা জ্ঞানীদের পথ দেখিয়েছিল।
- মিসলটো ও হলি। প্রাচীন শীতকালীন উৎসবের উপকরণ; পরে আশীর্বাদ ও রক্ষার প্রতীক।
কলকাতার বড়দিন
ভারতে বড়দিনের সবচেয়ে বড় নাগরিক উদ্যাপনগুলির একটি কলকাতায়। ঔপনিবেশিক ইতিহাস, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, আর্মেনীয় ও পর্তুগিজ সম্প্রদায়ের উপস্থিতি এবং শহরের উৎসবপ্রিয়তা — সব মিলিয়ে এখানে বড়দিনের নিজস্ব চেহারা।
- পার্ক স্ট্রিট। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে গোটা রাস্তা আলোয় সাজে; ভিড় দুর্গাপূজার ঠাকুর দেখার সঙ্গে তুলনীয়।
- সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল ও সেন্ট জনস চার্চ — মধ্যরাতের প্রার্থনাসভা।
- বো ব্যারাকস। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পাড়ার নিজস্ব উদ্যাপন, ঘরে তৈরি কেক ও ওয়াইন।
- অ্যালেন পার্ক — বড়দিন উৎসবের কেন্দ্র, সংগীতানুষ্ঠান ও খাবারের স্টল।
- নাহুমস ও পুরনো বেকারি — ফ্রুট কেক ও প্লাম কেকের জন্য ডিসেম্বরজুড়ে লম্বা লাইন।
লক্ষণীয়, কলকাতায় বড়দিন কেবল খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উৎসব নয় — সব ধর্মের মানুষ কেক, আলোকসজ্জা ও পার্ক স্ট্রিটের ভিড়ে অংশ নেন। গোয়া, কেরল ও মুম্বইতেও উদ্যাপন ব্যাপক, প্রতিটিরই নিজস্ব ধরন।
কয়েকটি তথ্য
- ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালনের প্রথম লিখিত নথি ৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে, রোমে।
- ইংল্যান্ড ও আমেরিকার কিছু অঞ্চলে সপ্তদশ শতকে পিউরিটান শাসনে বড়দিন উদ্যাপন নিষিদ্ধ ছিল।
- “Xmas” লেখাটি অসম্মানজনক নয় — “X” এসেছে গ্রিক অক্ষর খি থেকে, যা দিয়ে খ্রিস্ট শব্দ শুরু।
- সান্তা ক্লজের আজকের চেহারা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয় মূলত বিংশ শতকে।
- “জিঙ্গল বেলস” মূলত থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের জন্য লেখা হয়েছিল — এই কথাটি বহুল প্রচলিত, তবে ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়।
সাধারণ প্রশ্ন
বাংলায় ক্রিসমাসকে “বড়দিন” বলা হয় কেন?
প্রচলিত ব্যাখ্যা — শীতকালীন অয়নান্তের পর থেকে দিন আবার বড় হতে শুরু করে; সেই ঘুরে দাঁড়ানোর দিনই বড়দিন।
যিশু কি সত্যিই ২৫ ডিসেম্বর জন্মেছিলেন?
বাইবেলে দিন বা মাসের উল্লেখ নেই। ২৫ ডিসেম্বর তারিখটি পরে নির্ধারিত হয় — প্রতীকী ও সাংস্কৃতিক কারণে।
প্রথম কবে বড়দিন পালিত হয়েছিল?
২৫ ডিসেম্বর পালনের প্রথম লিখিত নথি ৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে, রোমে।
ক্রিসমাস ট্রির রীতি কোথা থেকে এল?
চিরসবুজ গাছকে জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখার ধারণা প্রাচীন। সাজানো গাছের রীতি জার্মানিতে ষোড়শ শতকে শুরু হয়।
সান্তা ক্লজ কে?
চতুর্থ শতকের বিশপ সেন্ট নিকোলাস, ওলন্দাজ সিন্টারক্লাস এবং ঊনবিংশ শতকের কবি-শিল্পীদের কল্পনার মিশ্রণে আজকের রূপ।
কলকাতায় বড়দিন কোথায় দেখব?
পার্ক স্ট্রিটের আলোকসজ্জা, অ্যালেন পার্কের উৎসব, বো ব্যারাকসের পাড়াকেন্দ্রিক উদ্যাপন এবং সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের মধ্যরাতের প্রার্থনা।
“Xmas” লেখা কি অসম্মানজনক?
না। “X” এসেছে গ্রিক অক্ষর খি থেকে, যা দিয়ে খ্রিস্ট শব্দ শুরু হয়।