ভক্তিই শক্তি

ধ্যানচর্চার প্রধান শিক্ষক ও ধারা

ধ্যানচর্চার প্রধান শিক্ষক ও ধারা

ধ্যান ও মাইন্ডফুলনেস চর্চায় যাঁদের নাম আজ সবচেয়ে বেশি শোনা যায় — তাঁদের পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠান ও পটভূমির একটি নিরপেক্ষ পরিচয়।

ধ্যানের পরম্পরা ভারতে হাজার বছরের পুরনো। আধুনিক কালে কয়েকজন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান এই চর্চাকে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, প্রায়ই প্রাচীন পদ্ধতির সঙ্গে সমকালীন ভাষা মিলিয়ে।

নিচে কয়েকজনের পরিচয় দেওয়া হল — তথ্য হিসেবে, সুপারিশ হিসেবে নয়। কোনো পথ বেছে নেওয়ার আগে নিজে যাচাই করে নেওয়াই উচিত।

বাংলার পটভূমি

আধুনিক ভারতে ধ্যানচর্চার প্রসারে বাংলার ভূমিকা গোড়ার দিকেই। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮৩৬–১৮৮৬) দক্ষিণেশ্বরে সাধনা করেন এবং নানা পথের সমন্বয়ের কথা বলেন। তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩–১৯০২) রাজযোগ গ্রন্থে পতঞ্জলির যোগসূত্রকে আধুনিক পাঠকের কাছে ব্যাখ্যা করেন — পশ্চিমে ভারতীয় ধ্যানপদ্ধতির পরিচয় মূলত সেখান থেকেই।

পরবর্তী কালের প্রায় সব ধারাই কোনো না কোনোভাবে এই পটভূমির সঙ্গে যুক্ত।

সমকালীন শিক্ষক ও ধারা

সদ্‌গুরু জাগ্গি বাসুদেব — ইশা ফাউন্ডেশন

কোয়েম্বাটুর-ভিত্তিক ইশা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রধান কর্মসূচি ইনার ইঞ্জিনিয়ারিং, যেখানে শাম্ভবী মহামুদ্রা ক্রিয়া শেখানো হয় — শ্বাস ও মনোযোগভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট ক্রিয়া।

শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর — আর্ট অফ লিভিং

আর্ট অফ লিভিং সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর পদ্ধতির কেন্দ্রে সুদর্শন ক্রিয়া — ছন্দবদ্ধ শ্বাস-অভ্যাসের একটি নির্দিষ্ট ক্রম। সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে কর্মশালা পরিচালনা করে।

ব্রহ্মাকুমারী শিবানী — রাজযোগ

ব্রহ্মাকুমারীজ সংস্থার শিক্ষক। তাঁর আলোচনার মূল বিষয় চিন্তা ও মানসিক শক্তির সম্পর্ক — নেতিবাচক চিন্তার ধরন চিনে তা বদলানোর অভ্যাস। টেলিভিশন ও ইন্টারনেটে তাঁর আলোচনা ব্যাপকভাবে দেখা হয়।

উল্লেখ্য, ব্রহ্মাকুমারীদের রাজযোগ পতঞ্জলির রাজযোগ থেকে আলাদা — নাম এক হলেও পদ্ধতি ভিন্ন।

গৌর গোপাল দাস

ইসকনের সন্ন্যাসী এবং বক্তা। প্রকৌশলে পড়াশোনার পর সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তাঁর আলোচনার বিষয় মূলত দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা — সম্পর্ক, কাজের চাপ, সিদ্ধান্ত — গল্প ও রসিকতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা।

দীপক চোপড়া

ভারতীয় বংশোদ্ভূত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত চিকিৎসক ও লেখক। তিনি ধ্যান ও আয়ুর্বেদকে আধুনিক ভাষায় উপস্থাপন করেন। তাঁর কিছু বৈজ্ঞানিক দাবি নিয়ে গবেষকমহলে সমালোচনা রয়েছে — এটি জেনে রাখা ভালো।

প্রয়াত শিক্ষক, যাঁদের প্রভাব রয়ে গেছে

থিক নাট হান (১৯২৬–২০২২)

ভিয়েতনামের বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, ভারতীয় নন — তবে তাঁর লেখা ভারতেও ব্যাপকভাবে পঠিত। তাঁর প্রধান শিক্ষা দৈনন্দিন কাজেই সচেতনতা — হাঁটা, খাওয়া, বাসন মাজা, সবেতেই। পশ্চিমে মাইন্ডফুলনেসের প্রচলিত রূপ অনেকটাই তাঁর কাছ থেকে এসেছে।

ওশো (১৯৩১–১৯৯০)

তাঁর ডায়নামিক মেডিটেশন প্রচলিত ধ্যান থেকে আলাদা — প্রথমে দ্রুত শ্বাস ও শারীরিক সঞ্চালন, তারপর নীরবতা। তাঁর যুক্তি ছিল, আধুনিক মানুষ সরাসরি স্থির হয়ে বসতে পারেন না।

ওশোর জীবন ও তাঁর প্রতিষ্ঠান ঘিরে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে, বিশেষত আমেরিকায় তাঁর আশ্রম সংক্রান্ত ঘটনাবলি নিয়ে। তাঁর পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ থাকলে এই পটভূমিও জেনে রাখা উচিত।

একহার্ট টলি

জার্মান বংশোদ্ভূত, কানাডা-নিবাসী লেখক; ভারতীয় নন। দ্য পাওয়ার অফ নাউ বইটির মাধ্যমে বর্তমান মুহূর্তে থাকার ধারণা বহু পাঠকের কাছে পৌঁছেছে।

শিক্ষক বাছাই করার আগে

ধ্যানচর্চায় এখন বহু সংস্থা ও শিক্ষক রয়েছেন। কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা ভালো:

  • শুরু করার জন্য কোনো কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া আবশ্যক নয়। শ্বাসের উপর মনোযোগ — এটুকু নিজেই শুরু করা যায়।
  • আর্থিক চাপ, সম্পূর্ণ আনুগত্যের দাবি বা পরিবার থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা — এগুলি সতর্ক হওয়ার লক্ষণ।
  • রোগ সারানোর দাবি নিয়ে সতর্ক থাকুন। ধ্যান সহায়ক হতে পারে, চিকিৎসার বিকল্প নয়।
  • একাধিক ধারা থেকে শেখা যায়। কোনো একটি পথেই আবদ্ধ থাকার প্রয়োজন নেই।

এই লেখাটি তথ্যভিত্তিক পরিচয়; কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার অনুমোদন নয়। মানসিক সমস্যায় চিকিৎসক বা মনোবিদের পরামর্শ নিন।

নিজে শুরু করতে চাইলে দেখুন: ধ্যান শুরু করবেন কীভাবে

সাধারণ প্রশ্ন

শুরু করতে কি কোনো শিক্ষকের কাছে যেতেই হবে?

না। শ্বাসের উপর মনোযোগ দিয়ে নিজেই শুরু করা যায়। নির্দিষ্ট ক্রিয়া বা জোরালো প্রাণায়াম শিখতে চাইলে অভিজ্ঞ শিক্ষকের তত্ত্বাবধান কাজে দেয়।

এই পদ্ধতিগুলি কি উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার চিকিৎসা?

না। ধ্যান সহায়ক হতে পারে, কিন্তু কোনো কর্মসূচিই চিকিৎসার বিকল্প নয়। মানসিক অসুস্থতায় পেশাদার পরামর্শ নিন।

এঁদের শিক্ষা কি নির্দিষ্ট ধর্মের সঙ্গে যুক্ত?

ভিন্ন ভিন্ন। কেউ নির্দিষ্ট পরম্পরার মধ্যে থেকে শেখান, কেউ ধর্মনিরপেক্ষ ভাষায়। যোগ দেওয়ার আগে জেনে নেওয়া ভালো।

ব্রহ্মাকুমারীদের রাজযোগ কি পতঞ্জলির রাজযোগ?

না। নাম এক হলেও পদ্ধতি ও দর্শন আলাদা।

কোনো সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগে কী দেখা উচিত?

আর্থিক দাবি, সম্পূর্ণ আনুগত্যের প্রত্যাশা, পরিবার থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা বা রোগ সারানোর প্রতিশ্রুতি — এগুলি সতর্ক হওয়ার লক্ষণ।

বাংলার পরম্পরায় কারা গুরুত্বপূর্ণ?

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ও স্বামী বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দের রাজযোগ গ্রন্থ পতঞ্জলির যোগসূত্রকে আধুনিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়।

Jeevan Tipke
Written by

Bachelor of Engineering (B.E.), MBA | Certified Digital Marketing Professional (SEMrush, LinkedIn, Amazon, Skillup & HubSpot)

Jeevan Tipke writes on Hindu devotion at BhaktiMeShakti, covering aartis, chalisas and mantras alongside the stories, puja vidhi and fasting rules behind major deities and festivals.