মহাশিবরাত্রি ২০২৬ পড়েছে ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার। নিশীথ কাল ও চার প্রহরের সময়সূচি, ঘরে পূজার সম্পূর্ণ বিধি এবং এই রাতের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।
মহাশিবরাত্রি ভগবান শিবের উদ্দেশে নিবেদিত সবচেয়ে পবিত্র রাত। অধিকাংশ হিন্দু উৎসব দিনের বেলায় পালিত হলেও শিবরাত্রির আরাধনা হয় রাতে — অজ্ঞতার উপর চেতনার জয়ের প্রতীক হিসেবে।
মহা অর্থ মহান এবং রাত্রি অর্থ রাত — অর্থাৎ শিবের মহান রাত্রি। পরম্পরা অনুসারে এই রাতেই শিব ও পার্বতীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল; আবার এই রাতকে শিবের তাণ্ডব — সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মহাজাগতিক নৃত্যের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।
বিস্তারিত কাহিনি পড়ুন: শিব ও পার্বতীর বিবাহ — মহাশিবরাত্রির কাহিনি।
২০২৬ সালে মহাশিবরাত্রি কবে?
হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকা অনুসারে মহাশিবরাত্রি ২০২৬ পড়েছে ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার — ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে।
পূজার সময়সূচি (ভারতীয় প্রমাণ সময়)
| বিষয় | তারিখ ও সময় |
| মহাশিবরাত্রি | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রবিবার |
| নিশীথ কাল পূজা | রাত ১২:০৯ – ভোর ০১:০১ (১৬ ফেব্রুয়ারি) |
| চতুর্দশী তিথি আরম্ভ | বিকেল ০৫:০৪, ১৫ ফেব্রুয়ারি |
| চতুর্দশী তিথি সমাপ্ত | বিকেল ০৫:৩৪, ১৬ ফেব্রুয়ারি |
| পারণ (উপবাস ভঙ্গ) | সকাল ০৬:৫৭ – দুপুর ০৩:২৪, ১৬ ফেব্রুয়ারি |
এই সময় ভারতীয় প্রমাণ সময় অনুযায়ী এবং সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়ের উপর নির্ভরশীল। কলকাতা বা অন্য কোনো স্থানে সময় কিছুটা আলাদা হতে পারে — নিজের স্থানীয় পঞ্জিকা দেখে নিন।
নিশীথ কাল ও চার প্রহর
শিবরাত্রির সমস্ত সময়ের মধ্যে নিশীথ কাল — মধ্যরাতের সেই সংক্ষিপ্ত পর্ব — সবচেয়ে পবিত্র বলে গণ্য। এই সময়ে অভিষেক, মন্ত্রজপ ও ধ্যান করা হয়।
সারা রাতকে ভাগ করা হয় চারটি প্রহরে, প্রতিটি প্রায় তিন ঘণ্টার। যাঁরা সারারাত জাগরণ করেন, তাঁরা প্রতি প্রহরে আলাদা করে পূজা করেন।
- প্রথম প্রহর — সন্ধ্যা ০৬:০৯ থেকে রাত ০৯:১৪। সূর্যাস্তের পর শুরু; শুদ্ধিকরণ ও প্রস্তুতির পর্ব।
- দ্বিতীয় প্রহর — রাত ০৯:১৪ থেকে ১২:০৯। অভিষেক ও মন্ত্রজপ।
- তৃতীয় প্রহর — রাত ১২:০৯ থেকে ভোর ০৩:০৪। এর মধ্যেই নিশীথ কাল; এটিই সবচেয়ে শুভ পর্ব।
- চতুর্থ প্রহর — ভোর ০৩:০৪ থেকে ০৫:৫৯। জাগরণের সমাপ্তি ও প্রার্থনা।
সারারাত জাগা সম্ভব না হলে কেবল নিশীথ কালে পূজা করলেও চলে।
ঘরে পূজার বিধি
- প্রস্তুতি। পূজার স্থান পরিষ্কার করুন, শিবলিঙ্গ বা শিবমূর্তি স্থাপন করুন, প্রদীপ ও ধূপ জ্বালান।
- অভিষেক। শিবরাত্রির পূজার কেন্দ্রীয় অঙ্গ। জল, দুধ, দই, মধু ও ঘি দিয়ে শিবলিঙ্গে অভিষেক করুন। প্রতিটি নিবেদন শুদ্ধি ও সমর্পণের প্রতীক।
- বেলপাতা নিবেদন। তিন পাতাযুক্ত বেলপাতা শিবের অত্যন্ত প্রিয়। সঙ্গে ধুতুরা ফুল, আকন্দ ও সাদা ফুল নিবেদন করা হয়।
- মন্ত্রজপ। ওঁ নমঃ শিবায় — পঞ্চাক্ষর মন্ত্র জপ করুন। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রও পাঠ করা হয়।
- আরতি ও প্রার্থনা। আরতি দিয়ে পূজা সম্পন্ন করুন।
বিস্তারিত অভিষেকের নিয়ম জানতে দেখুন: মহাশিবরাত্রিতে রুদ্রাভিষেক।
উপবাস
বহু ভক্ত এই দিনে উপবাস করেন। কেউ নির্জলা, কেউ ফলাহার করে থাকেন। পরদিন পারণের সময়ে উপবাস ভঙ্গ করা হয়।
ডায়াবেটিস, নিম্ন রক্তচাপ, গর্ভাবস্থা বা কোনো দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা থাকলে নির্জলা উপবাস করবেন না। উপবাস ভক্তির প্রকাশ, শরীরকে কষ্ট দেওয়ার উপায় নয়।
বাংলায় শিবরাত্রি
বাংলায় শিবরাত্রির একটি বিশেষ দিক হল — এই ব্রত মূলত অবিবাহিত মেয়েরা পালন করেন, যোগ্য স্বামী প্রার্থনায়। বিবাহিত নারীরা দাম্পত্যের মঙ্গল কামনায় উপবাস করেন।
তারকেশ্বর, বাবা ধাম (দেওঘর) ও কালীঘাটের মতো স্থানে এই রাতে বিপুল ভিড় হয়। তারকেশ্বরে জল ঢালার রীতি বিশেষভাবে প্রচলিত।
এই রাতের তাৎপর্য
অন্য উৎসবের সঙ্গে শিবরাত্রির পার্থক্য এখানেই — এখানে জাঁকজমকের চেয়ে স্থিরতা, জাগরণ ও অন্তর্মুখিতার উপর জোর।
ভক্তেরা বিশ্বাস করেন, এই রাতে আন্তরিক আরাধনা মন শান্ত করে, ভয় ও অস্থিরতা কমায় এবং আধ্যাত্মিক স্বচ্ছতা আনে।
সাধারণ প্রশ্ন
২০২৬ সালে মহাশিবরাত্রি কবে?
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রবিবার — ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে।
নিশীথ কাল কী?
মধ্যরাতের একটি সংক্ষিপ্ত পর্ব, যা শিবরাত্রির সবচেয়ে শুভ সময় বলে গণ্য। ২০২৬ সালে তা রাত ১২:০৯ থেকে ভোর ০১:০১ পর্যন্ত।
চার প্রহর কী?
শিবরাত্রির রাতকে চারটি প্রায় তিন ঘণ্টার পর্বে ভাগ করা হয়। তৃতীয় প্রহরে নিশীথ কাল পড়ে, তাই সেটিই সবচেয়ে শুভ।
বাড়িতে পূজা করা যায়?
হ্যাঁ। শিবলিঙ্গ বা ছবি রেখে অভিষেক, বেলপাতা নিবেদন, মন্ত্রজপ ও আরতি — এটুকুই যথেষ্ট।
অভিষেকে কী কী দেওয়া হয়?
জল, দুধ, দই, মধু ও ঘি। সঙ্গে বেলপাতা, ধুতুরা ও সাদা ফুল নিবেদন করা হয়।
সারারাত জাগা কি বাধ্যতামূলক?
না। সম্ভব না হলে কেবল নিশীথ কালে পূজা করলেও চলে।
উপবাস সবার জন্য?
না। ডায়াবেটিস, নিম্ন রক্তচাপ, গর্ভাবস্থা বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা থাকলে নির্জলা উপবাস করবেন না; প্রয়োজনে ফলাহার করুন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বাংলায় এই ব্রত কারা পালন করেন?
মূলত অবিবাহিত মেয়েরা যোগ্য স্বামী প্রার্থনায়, এবং বিবাহিত নারীরা দাম্পত্যের মঙ্গল কামনায়। তবে যে কেউ পালন করতে পারেন।