ভক্তিই শক্তি

লক্ষ্মীপূজার বিধি: কোজাগরী ও দীপাবলি

লক্ষ্মীপূজার বিধি: কোজাগরী ও দীপাবলি

লক্ষ্মীপূজা দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা — সম্পদ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রার্থনা। বাংলায় প্রধান লক্ষ্মীপূজা হয় দুর্গাপূজার পরের পূর্ণিমায়, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা নামে। এই লেখায় ঘরে বসে পূজার সম্পূর্ণ বিধি, উপকরণ ও আরতি দেওয়া হল।

বাংলায় লক্ষ্মীপূজা কখন হয়?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। বাংলার বাইরে ভারতের বহু অঞ্চলে লক্ষ্মীপূজা হয় দীপাবলির রাতে, কার্তিক মাসের অমাবস্যায়। কিন্তু বাংলার পরম্পরা আলাদা:

  • কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা — বাংলার প্রধান লক্ষ্মীপূজা, হয় দুর্গাপূজার পরের পূর্ণিমায় (আশ্বিন মাসের শারদ পূর্ণিমা)। বিজয়া দশমীর প্রায় পাঁচ দিন পরে।
  • দীপাবলির রাত — বাংলায় এই রাতে মূলত কালীপূজা হয়, লক্ষ্মীপূজা নয়।
  • প্রতি বৃহস্পতিবার — বহু বাঙালি গৃহে সাপ্তাহিক লক্ষ্মীপূজা ও পাঁচালি পাঠের রীতি রয়েছে।

কোজাগরী নামটি এসেছে “কো জাগর্তি” থেকে — অর্থাৎ “কে জেগে আছে?” বিশ্বাস, সেই রাতে দেবী লক্ষ্মী ঘুরে বেড়ান এবং যে গৃহ জেগে থেকে তাঁর আরাধনা করে, সেখানেই তিনি অধিষ্ঠান করেন। তাই এই রাতে জাগরণের রীতি।

নিচের বিধি দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য — কোজাগরী পূর্ণিমা হোক বা দীপাবলির সন্ধ্যা।

লক্ষ্মীপূজা কেন করা হয়?

বিশ্বাস করা হয়, দেবী লক্ষ্মী সেই গৃহে অধিষ্ঠান করেন যা পরিচ্ছন্ন, আলোকিত ও ভক্তিপূর্ণ। পুরাণ অনুসারে সমুদ্রমন্থনের সময় দেবী লক্ষ্মী আবির্ভূত হন — সেই কাহিনিই তাঁর আরাধনার ভিত্তি।

পূজার সূচনায় শ্রীগণেশের আরাধনা করা হয়, কারণ তিনি বিঘ্নহর্তা — তাঁর আশীর্বাদে পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।

পূজার আগে কী প্রস্তুতি নেবেন?

  1. ঘর পরিষ্কার করুন। পরিচ্ছন্ন গৃহেই দেবী অধিষ্ঠান করেন বলে বিশ্বাস।
  2. আলপনা দিন। বাংলার রীতিতে চালের গুঁড়ো গুলে সাদা আলপনা আঁকা হয় — প্রবেশপথ থেকে পূজার স্থান পর্যন্ত দেবীর পদচিহ্ন আঁকার রীতিও প্রচলিত।
  3. প্রদীপ জ্বালুন। ঘরের প্রতিটি কোণে প্রদীপ বা মোমবাতি দিয়ে অন্ধকার দূর করুন।
  4. আসন প্রস্তুত করুন। লাল বা হলুদ কাপড় পেতে তার উপর লক্ষ্মী ও গণেশের প্রতিমা বা ছবি পাশাপাশি রাখুন।
  5. উপকরণ গুছিয়ে রাখুন। পূজা শুরুর আগেই সব সামগ্রী হাতের কাছে রাখুন।

পূজার উপকরণ কী কী লাগবে?

উপকরণব্যবহার
লক্ষ্মী ও গণেশের প্রতিমা বা ছবিমূল আরাধ্য
ঘট (জল, আমপাতা ও ডাব-নারকেল সহ)শুদ্ধতা ও প্রাণের প্রতীক
লাল বা হলুদ কাপড়আসন পাতার জন্য
প্রদীপ ও ধূপকাঠিপূজার পরিবেশ
ফুল ও মালা (পদ্ম বিশেষ শুভ)নিবেদনের জন্য
মুদ্রা বা নোটসম্পদের প্রতীকী নিবেদন
নাড়ু, মিষ্টি, ফল ও শুকনো ফলভোগ ও প্রসাদ
চাল, হলুদ, সিঁদুর, চন্দনতিলক ও পূজার কাজে
পঞ্চামৃত (দুধ, মধু, দই, ঘি, চিনি)শুদ্ধিকরণের জন্য

কোজাগরী পূজায় বাংলার রীতিতে অতিরিক্ত থাকে নাড়ু, মুড়কি, খই, চিঁড়ে ও নারকেল — এবং পূজার শেষে লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ।

ধাপে ধাপে পূজার বিধি

১. স্থান শুদ্ধ করুন

গঙ্গাজল ছিটিয়ে ঘর ও পূজার স্থান শুদ্ধ করুন। ধূপ ও প্রদীপ জ্বালিয়ে শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন।

২. গণেশ বন্দনা

প্রথমে গণেশের আরাধনা করুন। ফুল, চাল ও মিষ্টি নিবেদন করে জপ করুন:
ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ

৩. দেবী লক্ষ্মীর আবাহন

মন্ত্র জপ করে দেবীকে আহ্বান করুন:
ওঁ শ্রীং মহালক্ষ্ম্যৈ নমঃ
ফুল, চাল ও সিঁদুর নিবেদন করুন এবং প্রতিমার সামনে মুদ্রা বা নোট রাখুন।

৪. ঘটস্থাপন

জলপূর্ণ ঘটের উপর লাল কাপড়ে জড়ানো নারকেল রাখুন। আমপাতা সাজিয়ে হলুদ ও সিঁদুরের ফোঁটা দিন।

৫. ভোগ নিবেদন

নাড়ু, মিষ্টি, ফল ও শুকনো ফল নিবেদন করুন। ঘরের চারপাশে প্রদীপ জ্বালুন।

৬. মূল পূজা

প্রতিমায় চন্দনের তিলক দিন। পদ্মফুল ও অক্ষত নিবেদন করে গোলাপজল ছিটিয়ে দিন। এরপর লক্ষ্মীস্তোত্র বা দেবীর অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ করুন।

৭. লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ

বাংলার রীতিতে এই পর্বই পূজার কেন্দ্র। পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে পাঁচালি ও ব্রতকথা শোনেন।

৮. হালখাতা ও কর্মস্থলের পূজা

ব্যবসায়ীরা হিসাবের খাতা, নথি বা কম্পিউটারের পূজা করেন — আগামী বছরের সাফল্য কামনায়।

৯. আরতি

ঘণ্টা বাজিয়ে ভক্তিভরে আরতি করুন এবং পূজা সম্পন্ন করুন।

লক্ষ্মী আরতি

নিচের আরতিটি “ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা” — সারা ভারতে প্রচলিত হিন্দি আরতি, বাংলা লিপিতে দেওয়া হল। বাংলার নিজস্ব পরম্পরায় এই সময়ে লক্ষ্মীর পাঁচালি ও ব্রতকথা পাঠের রীতি বেশি প্রচলিত।

ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা, মৈয়া জয় লক্ষ্মী মাতা।
তুমকো নিশিদিন সেবত, হরি বিষ্ণু বিধাতা॥
ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা॥

উমা রমা ব্রহ্মাণী, তুম হী জগ মাতা।
সূর্য চন্দ্রমা ধ্যাবত, নারদ ঋষি গাতা॥

দুর্গা রূপ নিরঞ্জনি, সুখ সম্পত্তি দাতা।
জো কোই তুমকো ধ্যাবত, ঋদ্ধি সিদ্ধি ধন পাতা॥

তুম পাতাল নিবাসিনী, তুম হী শুভদাতা।
কর্ম প্রভাব প্রকাশিনী, ভবনিধি কী ত্রাতা॥

জিস ঘর মেঁ তুম রহতীঁ, সব সদ্‌গুণ আতা।
সব সম্ভব হো জাতা, মন নহিঁ ঘবরাতা॥

তুম বিন যজ্ঞ ন হোতে, বস্ত্র ন কোই পাতা।
খান পান কা বৈভব, সব তুমসে আতা॥

শুভ গুণ মন্দির সুন্দর, ক্ষীরোদধি জাতা।
রত্ন চতুর্দশ তুম বিন, কোই নহিঁ পাতা॥

মহালক্ষ্মীজী কী আরতি, জো কোই জন গাতা।
উর আনন্দ সমাতা, পাপ উতর জাতা॥
ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা॥

পূজার উপযুক্ত সময় কোনটি?

  • কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা — পূর্ণিমা তিথিতে, সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত। জাগরণের রীতি থাকায় পূজা রাতেই হয়।
  • দীপাবলির লক্ষ্মীপূজা — প্রদোষ কাল, অর্থাৎ সূর্যাস্তের প্রায় দেড় ঘণ্টা পর।

তিথি ও সময় প্রতি বছর বদলায় এবং স্থানভেদে আলাদা হয়। সঠিক সময়ের জন্য আপনার স্থানীয় পঞ্জিকা দেখে নিন।

পূজার পরে কী করবেন?

  • পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করুন।
  • অন্তত একটি প্রদীপ সারারাত জ্বালিয়ে রাখুন।
  • কোজাগরীর রাতে সম্ভব হলে জেগে থেকে নামগান বা পাঠ করুন।
  • পূজার পর কিছুক্ষণ মূল দরজা খোলা রাখার রীতি রয়েছে।

সাধারণ প্রশ্ন

বাংলায় লক্ষ্মীপূজা কবে হয়?

প্রধান লক্ষ্মীপূজা হয় দুর্গাপূজার পরের পূর্ণিমায় — কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। এছাড়া বহু গৃহে প্রতি বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক পূজা হয়।

দীপাবলির রাতে বাংলায় কোন পূজা হয়?

বাংলায় দীপাবলির রাতে মূলত কালীপূজা হয়। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে সেই রাতেই লক্ষ্মীপূজা করা হয়।

“কোজাগরী” শব্দের অর্থ কী?

সংস্কৃত “কো জাগর্তি” অর্থাৎ “কে জেগে আছে?” বিশ্বাস, সেই রাতে দেবী জেগে থাকা ভক্তের গৃহে অধিষ্ঠান করেন।

পূজায় কী কী উপকরণ লাগে?

লক্ষ্মী ও গণেশের প্রতিমা, ঘট, প্রদীপ, ধূপ, ফুল, নাড়ু-মিষ্টি-ফল, চাল, সিঁদুর, চন্দন ও পঞ্চামৃত।

পূজার প্রথম ধাপ কী?

গঙ্গাজল ছিটিয়ে স্থান শুদ্ধ করা, প্রদীপ ও ধূপ জ্বালানো, এবং প্রথমে গণেশের আরাধনা করা।

কোন মন্ত্র জপ করা হয়?

প্রধান মন্ত্র ওঁ শ্রীং মহালক্ষ্ম্যৈ নমঃ। সেই সঙ্গে লক্ষ্মীস্তোত্র ও অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ করা হয়।

লক্ষ্মীর পাঁচালি কী?

বাংলায় প্রচলিত ব্রতকথা ও স্তব, যা পূজার শেষে পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে পাঠ করেন বা শোনেন।

গণেশের পূজা আগে করা হয় কেন?

গণেশ বিঘ্নহর্তা। তাঁর আশীর্বাদে পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় বলে প্রতিটি পূজার সূচনায় তাঁকে স্মরণ করা হয়।

Jeevan Tipke
Written by

Bachelor of Engineering (B.E.), MBA | Certified Digital Marketing Professional (SEMrush, LinkedIn, Amazon, Skillup & HubSpot)

Jeevan Tipke writes on Hindu devotion at BhaktiMeShakti, covering aartis, chalisas and mantras alongside the stories, puja vidhi and fasting rules behind major deities and festivals.